আমার অভিজ্ঞতায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ

photo credit: pixabay

আমার দেখা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ

আমি গোপিবাগ ৩য় লেনে বড় হয়েছি। ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চ আর কে, মিশন, মাঠে  দুইদিন ব্যাপি ক্রিকেট খেলার ফিল্ডিং দিয়ে ১ম ও ২য় লেনের টিমকে অলআউট করি। 

২৫ শে মার্চ আমাদের বেটিং করার কথা। সারাদিন ক্রিকেট ফিল্ডিং করে এতই ক্লান্ত ছিলাম যে পঁচিশে মার্চ সারা রাত হানাদার বাহিনীর গোলাগুলির একটা  শব্দও পাই নি। কথাটা যাকেই বলি সহজে কেহ বিশ্বাস করতে চায় না। কেননা সেদিন পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর গোলাগুলির শব্দে সমস্ত ঢাকা শহর প্রকম্পিত হয়ে গিয়েছিল। যাই হউক, ঘুম থেকে উঠে শুনি কারফিউ দেয়া হয়েছে। সকাল নয়টার পর কারফিউ শিথিল করা হল এবং আর্মির একটা জীপে হ্যান্ড মাইকের মাধ্যমে ঘোষনা করা হচ্ছিলো যে দেশে দুষ্কৃতিকারীতে ভরে গেছে তাদেরকে কঠিন হস্তে দমন করা হচ্ছে। পাকিস্তানবাসীদের কোন ভয় নাই। আমি হঠাৎ করে জীপটির সামনে পড়ে যাই। সেখান থেকে একজন আর্মি নেমে আমাকে বলে “মতিন খানকা মাকান কাহা হায়”, আমি বললাম সেকেন্ড লেন হায়। আর একজন আর্মি জীপ থেকে নেমে আমাকে প্যান্ট খুলতে বলে। আমিতো অবাক। তখন করিম মেম্বার নামে একজন (আমাদের এলাকা মেম্বার ছিলেন) তাদেরকে বললেন, যার অর্থ বুঝায় ছেলেটা মৌলানা সাহেবের ছেলে। এতকিছুর পরও আমার হ্যাফপেন্ট খুলে দেখলো আমি মুসলমান কিনা। এসব ঘটনায় আমি খুব ভয় পেয়ে মাকে বলি। তাৎক্ষনিকভাবে আমি আমার মাকে নিয়ে দেশের বাড়ী বি, বাড়িয়া নবীনগর থানার তিয়ারা গ্রামের উদ্দেশ্যে চলে যাই। 

ভালভাবে খেয়াল করে দেখলাম হাজার হাজার মানুষ গ্রামমুখি হতে শুরু করেছেন। সদরঘাট লঞ্জ টার্মিনালে লোকে লোকারন্য। অনেক কষ্টে একটা লঞ্জে আম্মা উঠে গেলেন কিন্তু আমি উঠতে পারলাম না। আমি কান্নাকাটি শুরু করলে লোকজন আমাকে সেই লঞ্জে উঠিয়ে দেন। তখন কিন্তু সবাই বিপদে অথচ মানুষের প্রতি মানুষের অনেক দয়া মায়া ছিল। লঞ্জে উঠে আরো অবাক হওয়ার পালা। কারো কাছ থেকে ভাড়াতো নিচ্ছেই না কোম্পানীর খরচে সবাইকে চা-বিস্কুট খাওয়াচ্ছে। সন্ধ্যার কিছুটা আগে নবীনগর লঞ্জ ভিড়লো। লঞ্জ ঘাটে শত শত লোক আত্মীয়সজনকে নেয়ার জন্য এবং ঢাকা শহরের খোজ নেয়ার জন্য ভিড় করে আছে। সে এক অভাবনীয় দৃশ্য।

রাতটা নবীনগর প্রপারে কাটালাম সকালে তিয়ারা গ্রামের উদ্দেশ্যে পায়ে হেটে রওয়ানা দিলাম। তখন যোগাযোগের কোন ব্যবস্থা ছিল না। অবস্থা দেখে ঘাবড়ে যাওয়ার মত অবস্থা মানুষ শহর থেকে স্রোতের মত গ্রামমুখি হচ্ছে পায়ে হেটে হেটে। কেউ নিজের গ্রামের দিকে যাচ্ছে। কেউ বা যাচ্ছে সিমান্ত পেরিয়ে আগরতলা। রাস্তায় রাস্তায় মানুষের সাহায্য সহযোগীতার দৃশ্য মনে হলে এখনও চোখ দিয়ে পানি আসে। চলবে…………

লেখকঃ
দ্বিধাবিভক্ত মন

0 comments:

Post a Comment